প্রকাশিত:
৬ আগষ্ট ২০২৫, ১৪:৩০
ধ্রুপদী-নৃত্য-গীতে পারদর্শী সম্ভ্রান্ত রমনীদের বলা হতো ‘বাই’। আর অতীতে ভারতের রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্য ‘বাই’ বলতে বোঝানো হতো ধ্রুপদী নৃত্যে ও গীতে পারদর্শী সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের। যে সকল নারী নৃত্য শিক্ষা শেষে, শাস্ত্রীয় নৃত্যকে পেশা হিসেবে বেছে নিতো, তাদের নামের সাথে সম্মানসূচক ‘জি’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হতো। তখনকার সময়ে ‘জি’ শব্দটি বর্তমান কালের উচ্চতর পদবির মতোই শোভা পেত নামের সাথে। বাইজিরা সম্রাট, সুলতান, বাদশা, রাজা, নবাব, ধর্নাঢ্য ব্যাক্তি জমিদার রঙমহলে শাস্ত্রীয় নৃত্য পরিবেশন করতেন অর্থের বিনিময়ে। এর পাশাপাশি তারা ব্যক্তিগত সুখ্যাতিও লাভ করতো। আধিপত্যশীল জমিদার-নবাবরা তাদের বাগানবাড়িতে সংগীত-নৃত্য বিশেষে পারদর্শী খ্যাতিনামা বাইজিদের রাখতেন। তাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো, এক রাতের জন্য নিজেদের সজ্জিত বিশেষ জলসা ঘরে।
রাজকীয় অনুষ্ঠান-যেখানে থাকতো অন্যান্য শৌখিন, অভিজাতশ্রেণী ও উচ্চবিত্তের লোকদের উপস্থিতি-সেই সকল অনুষ্ঠানে থাকতো, বাইজিদের নৃত্য-গান-বাজনা ও খানাপিনা। তারা যাওয়ার বেলায় নিয়ে যেত প্রচুর অর্থ। ১২০০ বাইজির জন্য তৎকালীন ৮০ হাজার টাকা দেয়া লাগতো। সম্ভ্রান্ত-সম্পদশালী সমাজ-নেতাদের বাগানবাড়ি, জলসাঘর কিংবা রঙমহলে শাস্ত্রীয় নৃত্য-গীত পরিবেশন করে অনেক পরিমাণে অর্থ ও খ্যাতিলাভ করতেন। অর্থ আয়ের জন্য তারা বাইরে গিয়ে ‘মুজরো’ আসরে গান গাইতেন ও নাচতেন। আবার তাদের নিজেদের ঘরেও ‘মাহফিল’ বসাতেন।
প্রাচীন ভারতের বাইজি-গণিকারা পরিচিত হতেন বিভিন্ন নামে এবং তাদের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ ছিল ৬ টি-
১. রাজবেশ্যা (রাজার অনুগৃহিতা গণিকারা)
২. নগরীবেশ্যা (নগরবাসিনী গণিকা)
৩. গুপ্তবেশ্যা (সদ্বংশীয় নারী যে গোপনে অভিসার করে)
৪. দেববেশ্যা (মন্দিরের দেবদাসী)
৫. ঊ্রহ্ম বেশ্যা বা তীর্থতা (যারা তীর্থস্থানে থাকেন)
৬. সাধারণ গণিকা।
এসব বাইজিরা শিল্পকলার বিবিধ গুণের মধ্যে অভিনয়-নৃত্য-বাদ্যযন্ত্রে-চিত্রাঙ্কন এবং চিত্রশিল্প অসাধারণ নৈপুণ্য, তারিফ করার ক্ষমতা, গানে সুর দেওয়া, সুচারুরূপে গৃহ সজ্জা, নান্দনিক প্রসাধন-চর্চায়, কেশ বিন্যাসে, রন্ধন শিল্পে, ধাঁধা তৈরি এবং সমাধানে পান্ডিত্য, পদ্যের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, কবিতা ও গল্প তৈরি করা, রত্ন চেনা, তাস-পাশা-জুয়া খেলার পারদর্শিতা, জড়তাহীন ভাবে সাবলিল কথাবার্তা, চোখ-ভুরু-মুখের বিশেষ ভঙ্গিতে কথা না বলেও মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের যোগ্যতা ও নৈপুণ্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন গুণী এই পেশায় যোগ দিতে পারতেন। আর এভাবেই তারা নিজকে একটি শিল্পে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল।
আজকের মতো তখনকার সময়েও পতিতাবৃত্তির প্রধান ও মৌলিক কারণ-অর্থনৈতিক সমস্যা। তখনকার সময়ে পতিতাবৃত্তি জীবিকানির্বাহ-বিনোদনমূলক একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হতো। বিক্রমাদিত্য-কৌটিল্যের কালে রীতিমতো রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতো পতিতারা।
কৌটিল্য শাস্ত্র অনুযায়ী, ‘গণিকার রূপ নষ্ট হয়ে গেলে তাকে ধাত্রীর পদে নিযুক্ত করতে হবে’। গণিকা ও দাসী যখন ভোগের অযোগ্য হবে, তখন তারা কাজ করবে রান্না ঘরে। তার মানে কৌটিল্য গণিকাদের পেশা থেকে অবসর নেবার পর তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছেন, কেননা তখনকার দিনে রাষ্ট্র ইচ্ছে করলেই নারীকে গণিকায় পরিণত করতে পারত’।
উত্তর ভারত বিশেষ করে লখনৌ বানারস, পাটনা থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলায়- বিশেষ করে কলকাতা এবং কিছু পরিমাণে ঢাকায় আগমন ঘটতে থাকে বাইজিদের। ঢাকার বাইজিদের নাচ গান শুরু হয় মোগল আমলে। সপ্তদশ শতাব্দীতে সূচনা হলেও উনিশ শতকে ঢাকার নবাবদের আমলে বাইজিদের নাচ-গান এবং মাহফিলে জোয়ার আসে। তারা আহসান মঞ্জিলের রংমহল, শাহবাগের ইসরাত মঞ্জিল, দিলকুশার বাগানবাড়িতে নৃত্য-গান পরিবেশন করতেন। ঢাকার বাইজিদের অনুষ্ঠান আয়োজনের স্মৃতিময় গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানের একটি হলো আহসান মঞ্জিল অন্যটি নিমতলী প্রাসাদ ।
সুলতানি আমলে নর্তকীদের পোশাকের একটি স্নিগ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়, ‘এরা হালকা লাল রঙের ফুল তোলা জামা পরে। শরীরের তলার দিকটায় এরা রঙিন রেশমের কাপড় জড়িয়ে রাখে। গলায় আর কাঁধে এদের পেনড্যান্ট আর হার। কবজিতে নীল আর দামি পাথর থাকে’।
সংগীতের জন্য ঢাকার খ্যাতি ছিল অটুট। ১৮৫৭ সালের পর এই খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়। ঢাকার পুরানো ঢাকার পাটুয়াটুলী ও জিন্দাবাহার লেন ছিল বাইজিদের সবচেয়ে বড় আখড়া। সন্ধ্যা হলে এসব আখড়ায় বসত ধ্রম্নপদী নৃত্য-গীতের আসর। বাইজিরা অপরুপ সাজে সেজে সূরের মূর্ছনা তুলে আসরে নাচত। তাদের নাচ-গানের সুমিষ্ট আওয়াজ পুরো এলাকা মুখর হয়ে উঠত। নবাব, জমিদাররসহ অভিজাত ব্যক্তিরা বাইজিদের আখড়ায় এসে তাদের নৃত্যগীত উপভোগ করতেন। যাদের সামর্থ্য ছিল তারা সুদূর লখনৌ থেকে বাইজি আনিয়ে নিজ রংমহলে নাচ-গানের মাহফিল বসাতেন। সেকালে বাইজিদের মাহফিল করা ছিল নবাব জমিদারদের অভিজাত্যের প্রকাশ।
লখনৌর অনেক বাইজি সংগীতজ্ঞ চলে আসেন মুর্শিদাবাদে। তারপরে আসেন ঢাকায়। তাঁদের সহায়তা করতেন নবাব পরিবারের বংশধরেরা, মৌলভীবাজারের মোগল বংশোদ্ভূত জমিদার ও নবাবপুরের ধনী বসাক পরিবার। এ ছাড়া যাঁরা সাহায্য করতেন তাঁরা হলেন ভাওয়ালের রাজপরিবার, কাশিমপুর বনিয়া ও পুবাইলের জমিদার। তখন লখনৌ, বেনারস, পাটনা ও কলকাতার প্রতিষ্ঠিত বাইজিরা ঢাকায় এসে তাঁদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।কণ্ঠসংগীতের ওস্তাদ হুসেন মিয়া ঢাকার অনেক বাইজিকে তালিম দিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে ঢাকার বাইজিদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। বহিরাগত অনেক বাইজি ঢাকায় দীর্ঘদিন থেকে গেছেন। কেউ কেউ থেকেছেন স্থায়ীভাবে। আবার অনেকে প্রায়ই ঘুরেফিরে ঢাকায় আসতেন। জানা যায়, এসব অস্থায়ী বাইজির পাশাপাশি স্থানীয় মেয়েদেরও বাইজির পেশা বেছে নিয়েছেন।
বাইজিদের সম্পর্কে ঢাকাবাসীর মধ্যে ছিল তীব্র কৌতুহল।পাটুয়াটুলীর বাইজিরা সঙ্গীদের নিয়ে হেঁটে খুব সকালে অদূরে বুড়িগঙ্গা নদীতে গোসলে যেত।গোসল পর্ব শেষে বাইজিরা যখন ফিরতো তখন লোকজন গলির মুখে দাড়িয়ে থেকে সিক্ত বাসনা বাইজিদের দেখে পুলকিত হতো। এছাড়া সাধারন মানুষের পরে বাইজিদের দেখার আর কোন সুযোগ ছিল না।
বাইজি নাচ-গান আর খেমটা নাচ-গানের মধ্যে পার্থক্যটা সত্যেন সেনের লেখায় ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। নওয়াব আবদুল গনি ও নওয়াব আহসানউল্লাহর দরবারের কয়েকজন বাইজির উল্লেখ করেছেন হাকিম হাবিবুর রহমান। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুপনজান, সেকালের নামী গায়িকা ও তবলাবাদক, এনাহীজান নওয়াব আবদুল গনির শাহবাগ উৎসবে নেচেছিলেন। আন্নু, গান্নু ও নওয়াবীন এই তিন বোন নওয়াব আবদুল গনির দরবারে নিয়মিত নাচতেন, গাইতেন এবং মাসোহারা নিতেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি ছিল নওয়াবীনের।
মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘এই তিন বোনই ‘পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি’ ভাড়া করে ১৮৮০ সালের নভেম্বরে টিকিটের বিনিময়ে ইন্দ্রসভা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। ঢাকায় মহিলাদের নিয়ে এটিই ছিল প্রথম নাট্যাভিনয়। আচ্ছি বাই ছিলেন নওয়াব আবদুল গনির সবচেয়ে নামকরা বাইজি। লখনৌ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। নৃত্য ও গীতে সুনিপুণা আচ্ছি ছিলেন অনেকের ওস্তাদ’। আর হাকিম হাবিবুর রহমান লিখেছেন, ‘ঢাকায় আচ্ছি বাইয়ের মতো বড় নর্তকী তার পরেও কেউ আসে নি’। আমিরজান বাইজি ছিলেন উনিশ শতকের ঢাকার বিখ্যাত গায়িকা।
ইংরেজ শাসন স্থায়ী হওয়ার পর বাইজি পেশায় ধীরে ধীরে ধস নামে। নবাব, জমিদারদের আয়ের উৎস কমে যেতে থাকে। তাদের পৃষ্টপোষকতা করা আর সম্ভব হয়নি। বাইজিরা হারিয়ে যেতে থাকে আর প্রকৃত বাইজির অবর্তমানে এক শ্রেনীর নকল বাইজির উদ্ভব ঘটে। নৃত্যগীত নয়, রুপ যৌবন ছিল তাদের মূল সম্পদ। আঁটসাঁট শরীরে নাচগানের মধ্যেই খরিদ্দাররা তাদের শরীর স্পর্শ করতে পারত। বাকী ইতিহাস অনেক করুণ ও বেদনাময় কালের সাক্ষী। কেউ জানে, কেউ বা রয় কল্পনায়।
বাইজিদের হাসি, গান আর আনন্দের পেছনে লুকিয়ে ছিল অনেক কান্না, বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস। কারও জন্ম ঘোর অন্ধকারে ঢাকা। অথচ এর জন্য তার কোনো হাত নেই। কেউ প্রতারিত হয়ে পথের ভিখারি হয়ে শেষ জীবন কষ্টে কাটিয়েছেন। যাঁরা ভাগ্যবান, তাঁরা স্বীকৃতি পেয়ে বেগম হতে পেরেছেন। আবার এঁদের কুহকের বলি হয়েছে অনেকের সংসার, জীবিকা ও জীবন। ঢাকার বাইজিদের দিন গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকেই ফুরিয়ে যেতে থাকে।আর এভাবেই স্মৃতির আকাশে হারিয়ে যায়…বাই’জি।
লেখক: রেহানা ফেরদৌসী, সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক), মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
মন্তব্য করুন: