প্রকাশিত:
১০ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:৪১
রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার আমলাব ইউনিয়নে অবস্থিত প্রাচীন জনপদ উয়ারী-বটেশ্বর—যার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার নিদর্শন। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও আড়িয়াল খাঁ নদীর মিলনস্থল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার পশ্চিমে বিস্তৃত এই টিলাময় লাল মাটির অঞ্চল আজ বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উয়ারী-বটেশ্বরই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন জনপদ, যার ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত প্রসারিত। এখানে পাওয়া গেছে ফসিল-উড ও পাথরের তৈরি প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার, তাম্রপ্রসার যুগের গর্তবসতির চিহ্ন, এবং প্রায় আড়াই হাজার বছর পুরোনো দূর্গপ্রাচীর। এসব প্রাচীরের চারপাশে রয়েছে গভীর পরিখা, যা আজও চোখে পড়ার মতো স্পষ্ট। ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। তখন থেকেই উয়ারী-বটেশ্বরকে একটি প্রাচীন নগর সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ প্রত্নস্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে গলিপথসহ ১৬০ মিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা, যা সে সময়ের নগর পরিকল্পনার প্রমাণ বহন করে।উয়ারী দূর্গের পশ্চিম-দক্ষিণে রয়েছে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার উঁচু একটি মাটির বাঁধ, স্থানীয়ভাবে যা ‘অসম রাজার গড়’ নামে পরিচিত।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এটি ছিল সেই সময়কার একটি প্রতিরক্ষা প্রাচীর বা নগর সীমা।২০০৮-০৯ সালের খননে কামরাবো এলাকার ‘ধুপির টেক’-এর মন্দিরভিটা আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণ মিলেছে, উয়ারী-বটেশ্বর ছিল আদি-মধ্যযুগে বৌদ্ধ সভ্যতার কেন্দ্র। এছাড়া এখানে পাওয়া গেছে পেরেক, লৌহমল, মরিচাপড়া ধাতব বস্তু ও পোড়ামাটির টুকরা, যা প্রমাণ করে—এই জনপদে লোহা গলানোর উন্নত প্রযুক্তি বিদ্যমান ছিল।এখানে পাওয়া নবড় মৃৎপাত্র ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির নিদর্শন প্রমাণ করে, উয়ারী-বটেশ্বর শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্রই নয়, ছিল এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ নগর।
প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী, অধ্যাপক, সাউথ এশিয়ান আর্কিওলজি, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, বলেন—উয়ারী-বটেশ্বরের সঙ্গে প্রাচীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। এখানে আবিষ্কৃত রুলেটেড মৃৎপাত্র, স্যান্ডউইচ কাঁচের পুঁতি, স্বর্ণআবৃত কাঁচের পুঁতি ও টিনমিশ্রিত ব্রোঞ্জ সেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংযোগেরই প্রমাণ বহন করে।
উয়ারী-বটেশ্বর আজ শুধু নরসিংদীর নয়, সমগ্র বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস ও সভ্যতার গর্ব। এটি প্রমাণ করে—বাংলার মাটিতেও এক সময় বিকশিত হয়েছিল উন্নত নগর সভ্যতা, যার গৌরবগাঁথা আজও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
মন্তব্য করুন: