প্রকাশিত:
২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:২৮
নেত্রকোণায় চাঁদা না দেওয়ায় সাজিদা আক্তার (৩৩) নামে এক গৃহবধূকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। পরে বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে।
ভুক্তভোগী সাজিদা আক্তার জেলা সদরের মেদনি ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের শামীম মিয়ার স্ত্রী। শামীম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে থাকেন।
এ ঘটনায় ওই গৃহবধূ বাদী হয়ে ৮ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে আদালতে মামলা করেছেন।
অভিযুক্তরা হলেন, একই গ্রামের সেকান্দার আলী (৫০), তার ভাই রুক্কু মিয়া (৫৫), সেকান্দরের ছেলে উজ্জ্বল মিয়া (২৮), রুক্কু মিয়ার ছেলে তরিকুল ইসলাম (২৭) ও মোমেন মিয়া (৩৫), একই পরিবারের আলম মিয়া (৪০), পিয়াস (২৮) এবং হিমেল মিয়া (২২)।
সোমবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নেত্রকোণা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়াসিম কুমার দাস বলেন, প্রাথমিক তদন্তে মারধর ও বাড়ি-ঘর ভাঙার সত্যতা পাওয়া গেছে। আহত সাজিদা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন সেই কাগজটা সংগ্রহ করে দিতে বলেছি। তদন্ত চলমান আছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষ করে আদালতে শিগগির আদালতে জামা দেওয়া হবে। পরে এ বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন।
এরআগে গত ৩০ অক্টোবর চাঁদা না পেয়ে সাজিদাকে মারধর করে বাড়িতে হামলা ও লুটপাট করে স্থানীয় প্রভাবশালী সেকান্দর ও তার পরিবারের লোকজন।
পরে ২ নভেম্বর এ ঘটনায় সাজিদা বাদী হয়ে সেকান্দরসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
সম্প্রতি সাজিদাকে পেটানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে নানা সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়- ঘরের সামনের উঁচু জায়গা থেকে সাজিদাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে পেটাচ্ছেন সেকান্দর ও তার লোকজন। একপর্যায়ে উঁচু জায়গা থেকে সাজিদাকে খালে ফেলে দিয়ে সেখানে গিয়েও মারধর করতে দেখা গেছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ভুক্তভোগী গৃহবধূ তার শ্বাশুড়িসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সরকারি বেরিবাঁধের পাশে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তার স্বামী সৌদি আরব প্রবাসী।
অভিযোগে বলা হয়, সেকান্দর আলী ও তার পরিবারের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে ওই গৃহবধূর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় বেরিবাঁধের ওপর থেকে ঘর বাড়ি সরিয়ে চলে যেতে বলেন। এতে আপত্তি জানালে গত ৩০ অক্টোবর সকালে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দলবদ্ধভাবে গৃহবধূর ঘর ও দোকানে হামলা চালায় সেকান্দরসহ তার লোকজন। দোকানের ক্যাশবাক্স, আলমারি, ট্রাংক ও প্লাস্টিক ড্রাম ভেঙে একাধিক স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা এবং দোকানের মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। লুট হওয়া সম্পদের মূল্য প্রায় সাত লাখ টাকা বলে দাবি করেন গৃহবধূ।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হামলার সময় সেকান্দর আলী গৃহবধূকে হত্যার উদ্দেশ্যে লোহার রড দিয়ে আঘাত করলে তার ডান হাতে গুরুতর ভাঙা জখম হয়। পরে সেকান্দর আলী তাকে বটি দিয়ে জবাই করে পানিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার ছেলে ছুটে এসে মায়ের জীবন রক্ষা করে।
এসময় গৃহবধূর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্থান ত্যাগ করে এবং মামলা করলে হত্যার হুমকিও দেয়।
ভুক্তভোগী সাজিদা আক্তার বলেন, আমাদের নিজস্ব কোন জায়গা জমি নেই। আমরা দীর্ঘ বছর ধরে এই বেরুবাঁধের পাশে ঘর বানিয়ে বসবাস করছি। আমাদের মতো আরও অনেক পরিবার এভাবে ঘর বানিয়ে বসবাস করছে। সেকান্দর ও তার পরিবারের লোকজন আমাদের এখান থেকে তুলে দিতে চাইছে। তারা বলছে- দুই লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে, না হলে এখানে থাকা যাবে না। আমার স্বামী বিদেশে থাকার কারণে তারা আমাকে অসহায় পেয়ে পিটিয়ে বাড়ি ঘরে থাকা টাকা স্বর্ণ সব লুটপাট করেছে ইচ্ছে মতো। দোকান ভেঙেছে, টয়লেটসহ সবকিছু গুড়িয়ে দিয়েছে।
অভিযুক্ত আলম মিয়া বলেন, আমি একটি কলেজে শিক্ষকতা করি। বছরে একদিনও বাড়িতে যাই না। এ ঘটনায় আমাকে আসামি করাটা দুঃখজনক। তবে জেনেছি-বেরিবাঁধের জায়গাটা যেটাতে এখন সাজিদারা বসবাস করছেন, সেটা আমাদের চাচাদের থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড অ্যকুয়ার করেছিলো। সাজিদাদেরকে টিনের ঘর করে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখন তারা বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এতে বাধা দেওয়ায় একটু হাতাহাতি হয়েছে। তবে চাঁদা দাবির বিষয়টি মিথ্যা। স্থানীয়ভাবে বসে এটা শেষ করতে পারলে ভালো হতো।
অপর অভিযুক্ত উজ্জ্বল মিয়া বলেন, চাঁদা দাবির বিষয়টি মিথ্যা। সাজিদারা ধীরে ধীরে বাড়ি ঘর বাড়িয়ে বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছিল। বাড়ি পাকা করে স্থায়ী করছিল। সরকার ওই জায়গা আমাদের থেকেই নিয়েছিল। তাই তাদের বাধা দেওয়া হয়েছিল, যেন আর জায়গা দখল না করে। তবে সাজিদা উল্টো দা নিয়ে আমার বাবা-চাচার ওপর হামলা চালায়।
মন্তব্য করুন: