প্রকাশিত:
১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬:৪১
গ্রামে শীতের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। ভোরের সূর্যও অনেক সময় সকাল গড়িয়ে দুপুরে এসে উঁকি দিচ্ছে। চারদিকে কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশা। এমন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই ভোরের কুয়াশা ভেজা পিচ্ছিল মাটিতে খালি পায়ে কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সাগর উপকূলীয় এলাকার লবণচাষীরা। দিন গড়িয়ে দুপুরে মাথার ওপর সূর্যের কড়া তাপ থাকলেও বসে থাকার সুযোগ নেই তাদের। সকাল থেকেই শুরু হয় লবণ উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ।
এ এলাকার অধিকাংশ লবণচাষী দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে পারিবারিকভাবে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসের শেষদিকে লবণ মাঠ তৈরির কাজ শুরু হয়ে উৎপাদন চলে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে টানা পরিশ্রম। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে অব্যাহত থাকে এ শ্রমসাধ্য কর্মযজ্ঞ।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে কক্সবাজার ও খুলনার পর চট্টগ্রামের একমাত্র উপজেলা বাঁশখালীতেই বাণিজ্যিকভাবে লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে। বাঁশখালীর পশ্চিম পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, চাম্বল ডিপুটিঘোনা, শীলকূপের পশ্চিম মনকিচর, সরল, কাথরিয়া ও খানখানাবাদ (আংশিক) এলাকায় ব্যাপকভাবে লবণ উৎপাদন হয়। প্রতিবছরের মতো চলতি মৌসুমেও কয়েক হাজার লবণচাষী মাঠে নেমেছেন। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশা কাটছে না তাদের। আগের মৌসুমের শতশত মেট্রিক টন লবণ এখনও চাষীদের নিয়ন্ত্রণে মজুদ রয়েছে।লবণচাষীরা জানান, সাগরের লবণাক্ত পানি দিয়েই লবণ উৎপাদন করা হয়। কাঠের রোলার দিয়ে জমি সমতল করার পর চারপাশে মাটির আইল দিয়ে ছোট ছোট প্লট তৈরি করা হয়। প্লটগুলো রোদে শুকানোর পর কালো বা নীল রঙের পলিথিন বিছানো হয়। জোয়ারের সময় নালা দিয়ে কিংবা ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সাগরের পানি জমির প্লটে প্রবেশ করানো হয়। এরপর ৪ থেকে ৫ দিন কড়া রোদে রাখলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং পলিথিনের ওপর লবণ জমে ওঠে।
চাষীরা জানান, শীতের কুয়াশা লবণ উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর। উৎপাদিত লবণ পানি ঝরার পর ব্যাপারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে এসব লবণ কারখানায় নিয়ে রিফাইনারি মেশিনে পরিশোধন শেষে বস্তা বা প্যাকেটে বাজারজাত করা হয়। উপজেলার অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় মাঠের পর মাঠজুড়ে এখন পলিথিন বিছিয়ে লবণ উৎপাদনের দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রতিদিন পলিথিন ছিদ্র হয়েছে কিনা তা নজরে রাখতে হয়, ছিদ্র হলেই তা পরিবর্তন করতে হয়।সরেজমিনে ছনুয়া ছেলবন এলাকায় দেখা যায়, একদল লবণচাষী পাইকারি দরে লবণ বিক্রির পর বড় জাহাজে তা তুলে দিচ্ছেন। তবে তাদের মুখে নেই হাসি। একদিকে উৎপাদন কম, অন্যদিকে বাজারদরও কম-দ্বিমুখী চাপে হতাশায় দিন কাটছে লবণচাষীদের।
স্থানীয় লবণচাষী মো. মিনহাজ বলেন, বর্তমানে মণপ্রতি লবণের পাইকারি মূল্য ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতিমণ লবণে শ্রমিক খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এককানি জমিতে লবণ চাষে জমির লাগিয়ত বাবদ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, পলিথিনে প্রায় ১০ হাজার টাকা এবং শ্রমিক, পানিসেচসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এর ওপর পাইকাররা মণপ্রতি অতিরিক্ত ১০ কেজি লবণ নিয়ে যায়। একই অভিযোগ করেন লবণচাষী মো. করিম, জিয়াব উদ্দিন, ফজল করিম, জোনাইদ ও বাদশা। তাদের ভাষ্য, মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা থাকলেও দিনশেষে লবণচাষীরা না পান ন্যায্যমূল্য, না পান পরিশ্রমের সঠিক পারিশ্রমিক।উত্তর পশ্চিম গন্ডামারা লবণ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লি.ুএর সহ-সভাপতি মো. ওসমান গণি বলেন, গত মাসে শুধু গন্ডামারা এলাকা থেকে মজুদকৃত প্রায় ৪০ হাজার মণ লবণ বিক্রি করা হয়েছে। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গন্ডামারা-সরল এলাকায় এখনও ৩০ থেকে ৪০ হাজার মণ লবণ মজুদ রয়েছে। এতে চাষিরা চরম হতাশায় ভুগছেন।
তিনি জানান, সমিতির আওতায় ৬ থেকে ৭ শতকানি জমিতে লবণ চাষ হলেও এখনও অনেক মাঠ পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে চাষিরা ধীরে ধীরে লবণ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, একসময় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পকারখানার মালিকরা সরাসরি এলাকায় এসে লবণ ক্রয় করলেও বর্তমানে তারা আগ্রহ হারিয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর থেকে লবণ বিক্রির জন্য তাদের কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে।
তিনি ধারণা করেন, বাইরে থেকে আমদানিকৃত লবণ ও ইনপুট সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে দেশীয় লবণের দাম কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বিসিকের কোনো কার্যকর তৎপরতা বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম না থাকায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। উপরন্তু শিল্পকারখানার জন্য আমদানিকৃত উদ্বৃত্ত লবণ আইন ও জনস্বাস্থ্য বিধি উপেক্ষা করে বাজারজাত হওয়ায় মাঠপর্যায়ের লবণের দরপতন এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি সহায়তার অভাবে মিল মালিক ও মহাজনরা লবণচাষিদের কাছ থেকে কম দামে লবণ কিনে তা পরে উচ্চমূল্যে বাজারজাত করছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে মাঠপর্যায়ে।
বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) ও লবণচাষি সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বাঁশখালী ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার একর জমিতে প্রায় ৩০ হাজার লবণচাষি লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিসিক সূত্র জানায়, চলতি বছর শুধু বাঁশখালী উপজেলাতেই প্রায় ২৫ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী লবণ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন: