প্রকাশিত:
২০ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬:১১
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা র্যাবের ডিএডি মোতালেবকে পায়ে গুলি, রড়-লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা প্রথমে ডিএডি (উপ-সহকারী পরিচালক) আবদুল মোতালেবের সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তার পায়ে গুলি করে। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলাকারীরা। এরপর লাঠি, রড, কাঠ—যা পেয়েছে, তা দিয়ে তাকে পিটিয়ে ঘটনাস্থলে হত্যা করে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় আসামি ধরতে গিয়ে মোতালেব এ হামলার শিকার হন। সেই সঙ্গে আক্রান্ত হন র্যাবের আরও দুই সদস্য ও এক সোর্স। তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। র্যাবের দুই সদস্য হলেন কনস্টেবল আরিফ ও নায়েক ইমাম। বিষয়টি নিশ্চিত করে র্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, আমাদের একটি অপারেশন টিম সলিমপুরে এক গুরুত্বপূর্ণ আসামি ধরতে যায়। অপারেশন চলাকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় ওই র্যাব সদস্য নিহত হন।

র্যাব-৭-এর এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে একটি মামলার সশস্ত্র আসামি লুকিয়ে আছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের ১৬ সদস্যের একটি দলে বিকেলে অভিযানে যায়। এ সময় একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কার্যালয়ে আসামি লুকিয়ে ছিল বলে ধারণা করে সেখানে চারজন ঢুকলে অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা হয়।
তিনি বলেন, আমাদের চার সদস্য ভেতরে প্রবেশ করার পরই ২০-২৫ জন লোক চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অত্যন্ত নৃশংসভাবে পেটালে তারা লুটিয়ে পড়েন। এর মধ্যে নায়েব সুবেদার আবদুল মোতালেব ঘটনাস্থলেই মারা যান।
হামলার সময় চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরও র্যাব সদস্যরা গুলি চালাননি। এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা নিশ্চিত হতে চাইছিলাম যে ভেতরে কোনো নিরীহ মানুষ আছেন কি না। আত্মরক্ষায় ন্যূনতম চেষ্টা ছাড়া সদস্যরা অস্ত্র ব্যবহার করেননি। হামলাটা ছিল পরিকল্পিত এবং হঠাৎ।এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, র্যাব সদস্যদের ওপর কারা হামলা চালিয়েছে তাদের চিহ্নিত করার চেস্টা চলছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের প্রভাব রয়েছে। সরকারি খাস পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র কারবারের মাধ্যমে তিনি এলাকাটিতে অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও দোকানপাট থেকে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের পর থেকে ইয়াছিন ও প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীগুলোর মধ্যে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে, যাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও ইয়াছিন বাহিনী পুনরায় এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাসজমি দখল, সন্ত্রাসী তৎপরতা, সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একটি অস্থিতিশীল এলাকা হিসেবে এটি পরিচিত। প্রায় তিন হাজার ১০০ একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এখানকার বসতিগুলো পাহাড়খেকো, সশস্ত্র দল ও দখলদারদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি জমির মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
গত বছর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা আরও বেড়েছে। এর আগেও প্রশাসন, র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে র্যাব সদস্য হত্যার ঘটনার পর ছিন্নমূল, আলীনগর ও লিংক রোড এলাকায় বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জঙ্গল ছলিমপুরে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে।
মন্তব্য করুন: